এক বৃষ্টিবেলায় । 2015




অবিরাম বৃষ্টির মধ্যে ঘুম ভাঙ্গা, সে খুব মজার ব্যাপার। বেলা অনেক হয়েছে, কিন্তু মনে হবে এই ভোর হল বুঝি। জানালা দিয়ে আলতো মিঠে আলো, কয়েকটা কাক উড়তে না পেরে পাশের বাড়ির কার্নিশের আচ্ছাদনের নিচে বন্ধ জানালার বাইরে বসে ভীষন খুনসুটি করছে, তার ক্যাও ক্যাও শব্দ আসছে, কিন্তু বিরক্ত লাগছে না মোটেই। ঝুপ ঝুপ করে জল পড়ছে, খুব জোরে নয়, একঘেঁয়ে, যেন থামার নেই, মালগাড়ি, চলতেই থাকবে। আবার থামলে থেমেই থাকবে। চা টা ঠান্ডা হবার আগেই সুড়ুৎ করে চুমুক না দিলে আজকে খুব ভুল হবে, সেই ভেবে উঠে বসলাম আলসেমি কাটিয়ে। চা হাফ শেষ হয়েছে হবে, রনি এসে বল্লো “কি মেসো, ঘুরতে যাবে না?”
যাওয়াই যায়, বৃষ্টি ধরে এসেছে প্রায়, যদিও মাঝে মাঝেই ঢালবে আজকে, তা প্রায় নিশ্চিত। ঘোলাটে আকাশ মাথায় নিয়ে বাইকে বেরিয়ে পড়লাম দুজনে। দামোদরের ধার বরাবর রাস্তা, তাই দিয়ে কিছু দূর যাওয়ার পরে হঠাৎ দেখি একটা পুঁচকে ছোঁড়া কোত্থেকে উদয় হয়ে বলছে “গাড়ি যাব্যাক নাই! এই ঠিঁয়ে লক মেরি চলি যাও, কেউ ধরব্যাক নেই।” সামনে একখানা খাল, তাতে হড়কা বানে পোলের মাটি ধুয়ে একাকার, ওপারে যাওয়ার উপায় নেই আর। ফিরে যাবো? নাহ, দেখেই যাই ওপারে কি আছে। বাইক রেখে, লক “মেরে” হাঁটা দিলাম – মস্ত পাইপের ওপরে পা রেখে রেখে এখনো পেরোনো যাচ্ছে, তাই ভরসা করে পেরিয়ে গেলাম নালাটা। ওপারে পৌঁছতেই একজন মানুষ জানতে চাইলেন “কাঁহা যেছে বাবু?” হিন্দি? এই বর্ধমানের গ্রামে? বললাম “নদী ধার!” একটু অবাক হল বটে, তারপর ভাবলো হয়তো  বা বাবুদের পাখানা যাবার জরুরৎ আছে, তাই এক দিকে দেখিয়ে বল্লো “পাঁজ মিন্টের রাস্তা, সিধা যান, ওই সাইটে আছে!” দু মিনিটের মাথায় গ্রামের শুরু, আর কি আশ্চর্য, এই গ্রামের সবাই হিন্দিভাষি।  কিন্তু এরা এখানেই বহু পুরুষ ধরে আছেন, হিন্দি পরিস্কার বলেন, আবার বাংলাও মন্দ বলেন না, তবে এক দুটো হিন্দি কথা ঢুকে যায়। এই গ্রামে তাই শীতলার বদলে সন্তোষী, আর বটগাছের গোড়ায় শিবের বদলে কালী মন্দির। শিব আছেন অবশ্যই, তবে অশ্বথের রূপে।
বৃষ্টি একটু ধরে আছে খানিক্ষন হল, তাই গুমোট গরম। ঘাম মুছতে মুছতে হাঁটতে লাগলাম, ভুট্টার ক্ষেতের আল ধরে। এদিক ওদিক দু একটা বাড়ি। তারা গোটা নয় একটুও, কিন্তু হাজার ভাঙ্গাচোরার মাঝেও উজ্জ্বল রঙের সমাহার সেখানে – দারিদ্রের ঔজ্জ্বল্য আগুনে হয়, সেটা আবার মনে পড়ে গেল। এক মহিলা কাপড় শুকোতে দিচ্ছিলেন, বৃষ্টি নির্ঘাত আবার হবে, তাই বাইরে নয়, খড়ের চালের আলগোছা ছাদনায়। আমি ক্যামেরা তুলতেই সুড়ুৎ করে দরজার ওপাশে চলে গেলেন, আর এলেন না। খানিক দাঁড়িয়ে ছিলাম, কিন্তু শুধুই দরজার ওপারে এক জোড়া চোখ, সে বাইরে এলে যেন তার মালিকের রুপ ক্ষুন্ন হবে, তাই তিনি আড়ালেই থাকলেন। দেওয়াল থেকে তাঁর মনের রঙ খানিক ধরে নিয়ে আমি আবার হাঁটা দিলাম, অন্য রঙের খোঁজে।
IMG_5886

Comments

Popular posts from this blog

Varanasi, the most vibrant and timeless city of India

Kasauli: encouraging, refreshing and entertaining encounter with mother nature

Kolkata, My City of Joy!