ঢুন্ডহুর দেশে
খেজুর করা আমার চিরকেলে স্বভাব। তা সেই খেজুর করতে করতেই ঢুন্ডুর কথা জিজ্ঞ্যেস করে ফেললাম। পরের এক মিনিট কেউ কথা বলল না। কেউ না।
সন্ধ্যা নেমে গেছে। মীনাবাজারে আজ হাটের দিন – সান্ধ্য হাট। দোকানে দোকানে ডুম কিম্বা চাইনিজ সি-এফ-এল জ্বলছে, সেখানে বিষম ব্যাস্ততা। কেউ বেচছে আলুর চপ, কেউ সিঙ্গাড়া, কেউ মুরগির মাংস দেওয়া ঘুগনি – চাট হিসেবে সবেরই বেশ চাহিদা কিনা। কেউ বা আবার জামাকাপড়, কেউ খুন্তি- কড়াই, কেউ রাস্তার ধারে ধোঁয়া উড়িয়ে বেচছে ঘটি গরম আর খোলাশুদ্ধ্ব বাদাম ভাজা, কয়েকজন আবার থোকা করে সুঁটকি মাছ। একজন চাউমিন ও বেচছে দেখলাম, খুব বিক্রি। যার বিদ্যুতের আলো নেই, সে জ্বেলেছে গ্যাসের পেট্রোম্যাক্স, আর একদম ছোট দোকানি লম্ফই যথেষ্ট।

মীনাবাজার বললে অনেকের হয়তো দিল্লীর লাল কেল্লার ভেতরের মীনা বাজারের কথা মনে পড়বে, কিন্তু এ সেরকম কিছুই নয় – নিতান্তই ছোট শহরের ছোট্ট বাজার, একদম কেজো আর শহুরে। বাজারের বাইরে পিচ ঢালা মেন রাস্তায় বড় বড় শিরীষ গাছের মাঝে সোডিয়াম ভেপারের ল্যাম্প, তার নিচে আলো ছায়ার মধ্যে হাট বসেছে। যেহেতু হাটের দিন, তাই রাস্তার ওপরেও আজ অনেক দোকান – কেউ প্লাস্টিকের ছাউনি খাটিয়ে দোকান, দিয়েছে, কেউ ঠ্যালাগাড়িতে, কেউ বা আবার একদম রাস্তার ধারের ঘাসের ওপরে প্লাস্টিক বা চট বিছিয়ে বসে পড়েছে। বাজারে খদ্দেরদের মধ্যে লুঙ্গি বা ধুতি পরা লোকের থেকে প্যান্টশার্ট পরা মানুষই বেশী, অনেকেরই বাইক আছে, সেসব রাস্তার ধারে পার্ক করে আঙ্গুলে চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে মালিকরা দোকানে দোকানে কেনাকাটা করছে।
এই একটু আগে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম, গলায় ক্যামেরা ঝুলছে, গোটা পাঁচেক ছেলে, বয়স গোটা কুড়ি হবে, আলাপ করলো আমার আর আর সৌম্যর সঙ্গে – ক্যামেরার দাম নিয়ে শুরু সেই বাক্যালাপ। আমি মূল টারগেট ছিলাম না, সৌম্যই ছিল। ও প্রথমে কিন্তু কিন্তু করে “পাঁচ হাজার” বলেই হঠাৎ আমার দিকে দেখিয়ে বলল “উনকা ওয়ালা ক্যামেরা কা জ্যাদা হ্যায়”, যাতে শান্তিতে ছবি তুলতে পারে – হাটে ভালো পোর্ট্রেট হওয়ার কথা। আমার যেমন স্বভাব, তাদের সঙ্গে বেশ খানিক খেজুর করে, বন্ধুত্ত্ব পাতিয়ে, তাদের হাল হকিকত জেনে, তাদের ছবি তুলে ও দেখিয়ে, অবশেষে এই গাড়ীর কাছে এসে দাঁড়িয়েছি। সৌম্য আর দেবদীপ গেছে আন্ডা ভুজিয়া প্যাক করাতে – সন্ধ্যের আয়োজন।
ওদের দেরী হচ্ছে আসতে, আমাদের ড্রাইভার ধনঞ্জয়জীর সঙ্গে খেজুর, সেও চলছে তাই। উনি বছর পঞ্চাশের গৃহী মানুষ, বেশ ভদ্রলোক, গল্প করতেও সমান আগ্রহী। তাই ভালই জমে উঠেছিল গপ্প। হঠাৎ মনে পড়ে গেল, জিজ্ঞ্যেস করলাম “ইঁয়াহা ঢুন্ডু সে লোগ ডরতে হ্যায় আব ভি?” একটু সময়ের ফাঁক, তারপর উত্তর এলো “ঢুনডু? উও কেয়া হুয়া জ্বী?” যাঁরা সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের লেখা কর্নেল সমগ্র পড়েছেন, তাঁদের কাছে ঢুন্ডু নতুন কিছু নয়। যাঁরা পড়েননি, তাঁদের জানাই – ঢুন্ডু হল ভুত্রাক্ষস! সে ভয়ঙ্কর জিনিস। ভুত আর রাক্ষসের সন্ধি। তারা মানুষ খায় আবার ভুতের মতো ব্যাভার, তাই কিরিবুরুর মানুষজন তাকে খুব ভয় পেতো। এখন যে আর পায়না, সেটা তো বোঝাই গেল। বুঝলাম, তাকে কেউ মনেও রাখেনি। কিরিবুরু পাল্টে গেছে তাহলে।
—
কলকাতা থেকে এখানে এসেছি আজ দুপুরে। সেই কোন ভোরবেলা একটা সাদা নো রিফিউস্যাল ট্যাক্সি নিয়ে প্রথমে সৌম্য, তারপরে দেবদীপকে তুলে হাওড়া পৌঁছে জন্শতাব্ধী এক্সপ্রেস ধরেছিলাম ছটা নাগাদ। খড়গপুর পেরনোর একটু পর থেকেই ছোট খাটো টিলা আর পাহাড় দেখা যাচ্ছিল, জামশেদপুর, চাঁইবাসা পেরিয়ে ডাঙ্গোয়াপোশি পোঁছতেই পাহাড়গুলো কেমন কাছে কাছে চলে এলো, জঙ্গলে ঢাকা। শীতের শেষ, তাই গাছে গাছে নানা রং। কিন্তু খুব ধুলো উড়ছে, আর সে ধুলোর রং লাল, শুদ্ধ ভাষায় যাকে বলে লোহিত। লোহার দেশ বলে কথা, লাল তো হবেই।
এর একটু পরেই নোয়ামুন্ডি আর বড়জামদা – আর তারপরেই বড়বিল। বড়বিলও সমতলেই, যদিও পাহাড় গুলো খুবই কাছে, স্টেশন থেকেই দেখা যায়। ষ্টেশনটা বেশ ইন্টারেস্টিং, একটাই প্ল্যাটফর্ম, লম্বা। তার অপরদিকটা সাদা রেলিঙ্গের বেড়া দেওয়া। বাঁয়ে স্টক ইয়ার্ড, সেখানের লাইন লালচে হয়ে আছে ধুলোতে। তার ওপারে কিছু ঢিবির মতো, দু একটা কারখানা দেখা যাচ্ছে। যদ্দুর বুঝলাম, একটাই এক্সপ্রেস ট্রেন আসে এখানে, সেটা এই শতাব্ধী। প্ল্যাটফর্মের পাশেই রেলিঙ্গের ওপারে রাস্তা, সেখানে গাড়ী দাঁড়ানোর জায়গা, আর সেই যায়গায় দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য লম্বা লম্বা শালগাছ। এই শালগাছগুলোই যায়গাটার ভোল পাল্টে দিয়েছে, বেশ যেন আরাম হচ্ছে – চোখের, মনেরও। ধনঞ্জয়জী আর তাঁর গাড়ীকে খুঁজে বার করতে লাগলো মিনিট দুয়েক। তিনজনে তিনটে জানলার পাশে বসে পড়লাম, ক্যামেরা ততক্ষনে ব্যাগ থেকে হাতে চলে এসেছে। ধনঞ্জয়জি সুখবর দিলেন – যদিও মেন রাস্তা একটু ঘুরপথে, আমাদের গাড়ীটা মেঘাতুর গাড়ী, তাই বোলানী মাইনের ভেতর দিয়েই যাওয়া যাবে, সম্মতি আছে।

আমের মুকুলে ভরা সারি সারি আমগাছ, তার মাঝে বাড়ী ঘর দোর কারখানা, এসব পেরিয়ে একটু যেতেই আশপাশ ক্রমশঃ লাল হতে শুরু করলো। দশ মিনিটে ঢুকে পড়লাম বোলানী মাইনের ভেতরে। লাল আর লাল, অ্যাম্বার বললেও হয়। যেন সূর্যের দেশ। সেই কমলা-লাল রাস্তা আসতে আসতে ওপরের দিকে উঠতে শুরু করলো, একটু পরেই দেখলাম অনেকটা উঠে এসেছি, নিচে দেখা যাচ্ছে বোলানীর জলাধার, তার পাশে কোয়ার্টার কিছু। চল্লিশ মিনিটে পৌছে গেলাম কিরিবুরু। ঘড়িতে তখন দুপুর তিনটে।
কিরিবুরু। হাতির পাহাড়। কিরিবুরু হল উড়িষ্যা-ঝাড়খন্ডের সংযোগস্থলে জোড়া পাহাড়ের একটি। অন্যটির নাম মেঘাহাতুবুরু। হাত দিয়ে মেঘ ধরা যায়, এমন পাহাড়। আদিবাসী অধ্যুষ্যিত সাঁওতাল পরগনায় পাহাড়ের নাম যে এমন সরল হবে, সে তো বলাই বাহুল্য। কিন্তু সেই মাটির কাছের, গাছের কাছের, নদীর কাছের, পাহাড়ের কাছের মানুষরা এখন দুরে সরে গেছেন অভিমান করে। পাহাড়ের ওপরে তাঁরা থাকেন না আর, সেখানে শহুরে মানুষ ঘাঁটি গেড়েছে। এমন বরাবর ছিল না। এই তো সেদিনও সারান্ডার ঘন জঙ্গল এর মাঝে লুকিয়ে ছিল কিরিবুরু। তারপর একদিন ভারত স্বাধীন হল, সরকার বললেন দেশকে গড়তে হবে ইস্পাত দিয়ে, তাই দেশে খুলল অনেক কটা ইস্পাত কারখানা। তার জন্যে দরকার লোহা, সেই লোহা পাওয়া গেলো এই পাহাড়ের বুকের মাঝে। পত্তন হল খনির, আর সেই খনিতে কাজ করেন যাঁরা, তাদের জন্য তৈরি হল শহর। আসলে উড়িষ্যা-ঝাড়খন্ডে যেমন পাহাড়ের ছড়াছড়ি, তেমনি আকরিক এর ও। এই অঞ্চলটা পুরোটাই লোহার আকরে ছেয়ে আছে, আর আছে অল্প কিছু ম্যাঙ্গানীজ এর খাদান। মান খুবই উচ্চস্তরের। দেশের তাবড় ইস্পাত কোম্পানীগুলো তাই আড্ডা গেড়েছে এখানে। নোয়ামুন্ডিতে টাটা, জোডাতেও (জোড়া?) তাই। রুংতা, জিন্দাল ও অন্যান্যরাও আছে, তবে এই কিরিবুরু-মেঘাহাতুবুরুর যমজ পাহাড়টা স্টিল অথরিটি অফ ইন্ডিয়ার অধীনে। স্টীল অথরিটি অফ ইন্ডিয়া লিমিটেড এর তৈরী এই শহর, আর তার পাশে খনি। গুগল ম্যাপে দেখলে মনে হবে, সবুজ দেহে লাল ঘা হয়েছে।
যখন অনেক ছোট, তখন আমার পিসতুতো ভাই অরিন্দমের কাছে প্রথম শুনেছিলাম কিরিবুরুর কথা। সেই থেকে যাওয়ার ইচ্ছে। সময় সুযোগ হয়ে ওঠেনি এই পর্যন্ত। কিন্তু দিন কয়েক আগে আমাদের পাড়ার সিনিয়র স্বপনদা যখন জানালেন যে তিনি রিটায়ার করার আগে কিরিবুরুতেই চাকরী করতেন, তখন আবদার করে বসলাম – আমাদের যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। মেঘাহাতুবুরুর এক উচ্চস্তরের কর্তা ওনার বিশেষ পরিচিত, তিনি বাঙ্গালিও বটে, স্বপন্দার ফোন থেকে তাঁকে ফোন করা হল, তিনি বললেন, কুছ পরোয়া নেহি, চলে আসুন, সব বন্দোবস্ত হয়ে যাবে। তাই বুক ঠুকে বেরিয়ে পড়লাম আমরা তিনজনে। সঙ্গে ডায়েরী, তাতে লেখা আছে স্বপনদার দেওয়া সব খুঁটিনাটি – কোথায় যাব, কি দেখবো, আর ব্যাগে সোয়েটার আর ক্যামেরা – কলকাতার শীত ফেব্রুয়ারির মাঝে উধাও হয়ে গেলেও কিরিবুরুতে তখনো বেশ ঠান্ডা।
—
ধনঞ্জয়জীর স্করপিও প্রথমে আমাদের নিয়ে গেল মেঘাহাতুবুরু মাইন ছাড়িয়ে মূল গেস্ট হাউসে – পাশেই বিখ্যাত মেঘাহাতুবুরু সানসেট পয়েন্ট। সেখানে চট করে মাংস-ভাত সাঁটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আবার – আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে হিল টপ গেস্ট হাউসে – সে এখান থেকে গোটা ছয় কিলোমিটার। ছোট্ট শহর, ফুড়ুৎ করে ফুরিয়ে গেলো একটু যেতেই, শুরু হল শালগাছের জঙ্গলের মাঝ দিয়ে পিচ বাঁধানো রাস্তা দিয়ে আমাদের চলা। এদিকে ওদিকে দুই একটা বাড়ী আর দোকানঘর, মাঝে মাঝেই সি আই এস এফের সতর্ক চোখ সেসব পেরিয়ে আরো একটু উঁচু যায়গায় উঠে পৌছলাম হিল টপ গেস্ট হাউসে। এটা আসলে সেইলের টেনিং সেন্টার, তার সাথে কয়েকজন থাকার মতো ব্যবস্থা। একধারে টানা এক ডজন ঘরের ঠিক মাঝখানে বেশ বড় ডাইনিং রুম। সামনে লন, লনের ওপারে ট্রেনিং এর হল আর ক্লাসরুম। লনের দুপাশে কেয়ারী করে সুন্দর সব ফুলগাছ, আর তাদের মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে আছে মস্ত সব তালগাছ। দূরে কিছু কোয়ার্টার, ভারত সঞ্চার নীগমের। শান্ত, নির্জন আর নিশ্চুপ, এতটাই, যে গাছ থেকে শালপাতা খসে পড়ছে, তার শব্দ পাওয়া যায় একটু কান পাতলেই। মনটা ভাল হয়ে গেলো বেশ। আরো আনন্দের খবর, আমাদের সেলফোনে সিগন্যালের নাম গন্ধ নেই বেশীর ভাগ যায়গায়, ধনঞ্জয়জি জানালেন, এখানে শুধু রিলায়েন্স আর ভারত সঞ্চার, সঙ্গে কিছু যায়গায় এয়ারসেল – আমরা যে রাস্তায় মাঝে মাঝে রোমিং সিগন্যাল পেয়েছে, সেটা এয়ারসেলেরই কল্যাণে – কিন্তু এখানে তারা দুর্বল, তাই আমরা আছি সেটা জানান দেওয়া যাবে শুধু আমরা নিজেরা চাইলে, রাস্তায় বেরিয়ে, নচেৎ লোকে শুনবে “ইয়ে সেলফোন আভি সেওয়া পারিসীমা কে বাহার হ্যায়”।
কেয়ারটেকারের খোঁজ করলাম। ডাইনিং রুমের সামনেই বসে ছিলেন তিনি। নাম রাজু পাত্র। মনে হল একটু মেজাজি মানুষ। প্রথমেই একটু বিরক্ত হলেন, কারন তাঁকে নাকি কেউ কিছু জানায় নি। সৌভাগ্য বশতঃ ঠিক সেই সময়ে বড়সাহেব ফোন করলেন, আর রাজুদাও বার কয়েক “হাঁ স্যার” বলে তারপর ঘর দেখে নিতে বললেন। ষোলটি ঘরের প্রত্যেকটাই বারো বাই পনেরো, সুন্দর পরিষ্কার টাইল লাগানো মেঝে, মাথার ওপরে ফলস সিলিং, মাঝে মস্ত বড় খাট, ওপাশের দেওয়ালে বাতানুকুল যন্ত্র বিরাজমান, যদিও সে আমাদের এইবেলা কাজে লাগবে না। ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে দেখলাম, রাজুদা কোথাও একটা যাচ্ছে, দেখলাম একটু খোঁড়াচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম, কি হয়েছে, এতক্ষনে এই প্রথম একটু হাসির আভাস দেখা গেল, বলল ক্রিকেট খেলতে গিয়ে চোট পেয়েছে।
ব্যাগ রেখে আবার বেরিয়ে পড়লাম, ঝপ করে সূর্য ডোবে পাহাড়ে, গাড়ী নিয়ে দৌড়লাম সানসেট পয়েন্টে। মেঘাহাতুবুরুতে ভি আই পি গেস্ট হাউসের ঠিক পাশেই এক খানা মস্ত বটগাছের নিচে, রেলিং দেওয়া সুন্দর জায়গা। বড় পাথর আছে কিছু, বসাও যায়।
মেঘাহাতুবুরু, অর্থাৎ কিনা হাত দিয়ে মেঘ ধরা যায়, এমন জায়গা। হয়তো যেতো কখনো, আজকে সে হয় না আর। কিম্বা হয়তো হয়, কিছু ভাগ্যবান মানুষের জন্যে। আমরা পাইনি। এই মেঘাতুর থেকেই দেখা যায় সাতশো পাহাডের সারির ব্যাকড্রপে সূর্যদেব অস্ত যাচ্ছেন। আশায় আশায় গেছলাম একখানা বাঘা সূর্যাস্ত দেখবো বলে, কিন্তু আকাশের দিকে তাকিয়ে ভরসা পেলাম না খুব। আকাশের আজ জল রং নিয়ে খেলার ইচ্ছে হয়েছে, সে ঢেকে যাচ্ছে ঘোলাটে নীল মেঘে। মাঝখানের অনেকটা জায়গা হাল্কা আগুন রঙ্গা হয়ে আছে বটে, কিন্তু সে সামনের ঘোলাটে কুয়াশার পেছনে সে মলিন। পরতে পরতে পাহাড়ের সারি ঠিক যেমন শুনেছিলাম, তেমনি আছে, কিন্তু আবছা, হাল্কা রং ধরেছে, অনেক্ষন ঠাহর করলে তবেই চোখে পড়ে। দূরে একটুখানি চিকচিকে জিনিস – ওটা রাংরিং নদীর বাঁধ।
হঠাৎই, আকাশের অনেক উঁচুতে, মেঘের মাঝে এক খানা ছোট্ট ফোকর দিয়ে টুউপ করে বেরিয়ে এলো সূর্য। উজ্জ্বল কমলা রং তার, তাকিয়ে থাকা যায় না এতোই জৌলুস। মিঠে সিঁদুরে রং ধরতে এখনো অনেক দেরি। নিজের তেজে নিজেই লজ্জা পেল বুঝি, এক মুহূর্তেই আবার লুকিয়ে গেলো মেঘের পেছনে, সারাদিনের মতো। সূর্য ডোবা দেখা হল না আজ। ফিরে যাব ভাবছিলাম। আরো দু একজন যাঁরা ছিলেন, তাঁরা পাড়ি দিলেন বাড়ীর দিকে। আমরাই রয়েছি, তিন জনা, এবারে ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে, রওনা দিচ্ছি, এমন সময় অন্য আকাশে চাইতেই চমকে উঠলাম! কি আঁকা ওখানে? বুঝিনি, কিন্তু তাও তাকিয়েই রইলাম। এই আঁকা শুধু আজকের, এই সময়ের জন্যে। অন্যদিন হলেও হতে পারে, কিন্তু সে অন্য ছবি – কালকের ছবি অন্য হবে। পাহাড় এমনই। তাকে ধন্যবাদ দেওয়া, তার কোনো মানে হয় না।

মীনাবাজারে থেকে আন্ডা ভুজিয়া, চিপ্স, চানাচুর, বিস্কুট, সিগারেট আর রাজুদার পায়ের জন্য মুভ কিনে গেস্ট হাউসে ফেরৎ এলাম। কিরিবুরুর প্রথম সন্ধ্যা নেমে আসতেই ঠান্ডা হাওয়া কানের লতি ছুয়ে বলে গেলো – শহুরে শরীর, সাবধান! গেস্টহাউসের বাগানের পায়ে চলা পথে নিঝুম অন্ধকার, হাওয়া বেড়েই চলেছে, এখন তার শোঁ শোঁ শন্ধ শুনলে মনে হয় আড়বাঁশী বাজানোর আগে কেউ পরখ করার ফুঁ দিচ্ছে যেন, খুউব জোরে। রাজুদার হাতে মলম তুলে দিতেই রাজুদা বেজায় খুশ – আমরা ঘরে ঢুকলাম – এবারে একটু আয়েস। ক্লান্ত পায়ে ঘরে ঢুকেছি, জুতো খুললাম, হাওয়ার আওয়াজ যেন বেড়ে গেলো ওই? এক দমকায় কারেন্ট চলে গেলো, বাইরে বেরিয়ে দেখি মন ভরা দুঃখের পরে খুব খুশীর খবরের মতো, বৃষ্টি
নেমেছে অঝোর ধারে। মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া ঝলক মস্ত লম্বা শালগাছেদের শাসন করে যাচ্ছে দিদিমনির মতো, কখনো বা একটু বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। একটা ব্যাটারীতে চলা সোডিয়াম ভেপার জ্বলে আছে এখনো বাইরে, একটুকু ভাললাগার মতো, তার কমলা রং ঘরের মোমবাতীর থেকে খুব আলাদা নয়। ব্যালকনির নেটের ওপরে বৃষ্টির জল উড়ে এসে আটকে রয়েছে, বাইরের আলোয় তা চকচকে এখন, জ্যোৎস্নায় বালিদানার মতো। পায়ে ইলশেগুঁড়ির মতো ঠান্ডা জলের ঝাট আদর করে যাচ্ছে, ফুলের গন্ধ পাচ্ছি, সোঁদা মাটির সঙ্গে মেশা, তার সঙ্গে দারুন একটা রান্নার গন্ধ মাঝে মাঝে হাল্কা ভাবে মিশে যাচ্ছে। শীত করছে, কিন্তু ঘরে ঢুকবো না। গান গাইছি, তিনজনেই। খুব ভালো লাগছে যেন? নেশা হয়ে গেলো কি তবে? ঘুম চোখে রাজুদার বউএর রান্না করা দারুন চিকেনের ঝোল ভাত-রুটি দিয়ে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম যখন, বাইরে তখনো হাওয়ার খেলা চলছে পুরোদমে, বৃষ্টিটা ধরেছে যদিও। দেবদীপ এখনো ঠিক করতে পারেনি রাজুদার বৌ তার দিদি, না আন্টি, নাকি সিম্পল ভাবীজি।
নেমেছে অঝোর ধারে। মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া ঝলক মস্ত লম্বা শালগাছেদের শাসন করে যাচ্ছে দিদিমনির মতো, কখনো বা একটু বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। একটা ব্যাটারীতে চলা সোডিয়াম ভেপার জ্বলে আছে এখনো বাইরে, একটুকু ভাললাগার মতো, তার কমলা রং ঘরের মোমবাতীর থেকে খুব আলাদা নয়। ব্যালকনির নেটের ওপরে বৃষ্টির জল উড়ে এসে আটকে রয়েছে, বাইরের আলোয় তা চকচকে এখন, জ্যোৎস্নায় বালিদানার মতো। পায়ে ইলশেগুঁড়ির মতো ঠান্ডা জলের ঝাট আদর করে যাচ্ছে, ফুলের গন্ধ পাচ্ছি, সোঁদা মাটির সঙ্গে মেশা, তার সঙ্গে দারুন একটা রান্নার গন্ধ মাঝে মাঝে হাল্কা ভাবে মিশে যাচ্ছে। শীত করছে, কিন্তু ঘরে ঢুকবো না। গান গাইছি, তিনজনেই। খুব ভালো লাগছে যেন? নেশা হয়ে গেলো কি তবে? ঘুম চোখে রাজুদার বউএর রান্না করা দারুন চিকেনের ঝোল ভাত-রুটি দিয়ে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম যখন, বাইরে তখনো হাওয়ার খেলা চলছে পুরোদমে, বৃষ্টিটা ধরেছে যদিও। দেবদীপ এখনো ঠিক করতে পারেনি রাজুদার বৌ তার দিদি, না আন্টি, নাকি সিম্পল ভাবীজি।
—
সন্ধ্যার নেশায় বাদলা হাওয়া লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমরা তিনজন। শীত শেষের সে বর্ষায় জংলা ফুলগাছের কাঁপুনি লেগেছিল কিনা আমাদের মতোই, তা জানতে পারিনি তাই। সকালে উঠে দেখি পাহাড়ের বোধহয় আমাদের সাথে রহস্য করার ইচ্ছে হয়েছে। কাল রাতের হঠাৎ বৃষ্টি, তার কথা তো
বলেইছি, আজ সকালের কুয়াশার ও কোনও খবর ছিল না কালকে বিকেলে। সকালটা যেন চোখের পরে পাখির পালকের ছোঁয়া, সামনে হাল্কা আলো আর গভীর কুয়াশা মেলামেশা করে ঢেকে দিচ্ছে পাহাড়কে। গত সন্ধ্যার বৃষ্টির পরে পাতাদের মধ্যে যারা একটু প্রাচীন, তারা জলের ভার ধরে রাখতে পারেনি, খসে এসে পড়েছে নিচের ঘাসের ওপরে। সেই আওয়াজে বেরিয়ে এসেছিলাম সে দৃশ্য দেখব বলে, কিন্তু এই জালের ওপরে সোডিয়াম ভেপারের আলোতে চকচক করতে থাকা জলের ফোঁটাতেই চোখ এমন আটকে গেছলো, ওপারের অল্প আলোয় ঘুমিয়ে থাকা শাল গাছের সারির দিকে চোখ যায়নি তেমন। সকালে উঠে আলো – কুয়াশার সঙ্গে তাদের মাখামাখি দেখে এবারে জালের ওপারেই আটকে গেলো চোখ, সামনের বাধা টা আর বাধা মনে হল না। কাল রাতের বৃষ্টির তেজ ছিল খুব। বাগানের অনেক ফুলগাছ ভেঙ্গে পড়ে আছে। পাতা ছিঁড়ে গেছে। ঝড়ের তরাসে শালগাছের হলদে-বাদামি পাতা ভূমিশয্যা নিয়েছে, তার পেছনে হারিয়ে গেছে অনেক ফুল।
তারই মাঝে অবিন্যস্ত পাপড়ি নিয়ে আকাশের দিকে ফিরে তাকিয়েছে একলা ক্যালেন্ডুলা, তার স্নান সবে শেষ হয়েছে মনে হয়, এখনো তার গায়ে জলের ফোঁটা, নিচের দিকে নামছে গড়িয়ে। তার পাশ দিয়ে ঝর্নার জলের উন্মত্ত ধারার মতো সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে কুচি কুচি সাদা মরশুমি ফুলের ঝাড়।
বলেইছি, আজ সকালের কুয়াশার ও কোনও খবর ছিল না কালকে বিকেলে। সকালটা যেন চোখের পরে পাখির পালকের ছোঁয়া, সামনে হাল্কা আলো আর গভীর কুয়াশা মেলামেশা করে ঢেকে দিচ্ছে পাহাড়কে। গত সন্ধ্যার বৃষ্টির পরে পাতাদের মধ্যে যারা একটু প্রাচীন, তারা জলের ভার ধরে রাখতে পারেনি, খসে এসে পড়েছে নিচের ঘাসের ওপরে। সেই আওয়াজে বেরিয়ে এসেছিলাম সে দৃশ্য দেখব বলে, কিন্তু এই জালের ওপরে সোডিয়াম ভেপারের আলোতে চকচক করতে থাকা জলের ফোঁটাতেই চোখ এমন আটকে গেছলো, ওপারের অল্প আলোয় ঘুমিয়ে থাকা শাল গাছের সারির দিকে চোখ যায়নি তেমন। সকালে উঠে আলো – কুয়াশার সঙ্গে তাদের মাখামাখি দেখে এবারে জালের ওপারেই আটকে গেলো চোখ, সামনের বাধা টা আর বাধা মনে হল না। কাল রাতের বৃষ্টির তেজ ছিল খুব। বাগানের অনেক ফুলগাছ ভেঙ্গে পড়ে আছে। পাতা ছিঁড়ে গেছে। ঝড়ের তরাসে শালগাছের হলদে-বাদামি পাতা ভূমিশয্যা নিয়েছে, তার পেছনে হারিয়ে গেছে অনেক ফুল।
তারই মাঝে অবিন্যস্ত পাপড়ি নিয়ে আকাশের দিকে ফিরে তাকিয়েছে একলা ক্যালেন্ডুলা, তার স্নান সবে শেষ হয়েছে মনে হয়, এখনো তার গায়ে জলের ফোঁটা, নিচের দিকে নামছে গড়িয়ে। তার পাশ দিয়ে ঝর্নার জলের উন্মত্ত ধারার মতো সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে কুচি কুচি সাদা মরশুমি ফুলের ঝাড়।
কিরিবুরু শহর থেকে উত্তরে যে রাস্তা চলে গেছে, সেই রাস্তা ধরলাম আমরা, সঙ্গী ধনঞ্জয়জী, বৃষ্টি আর ভালোলাগা। পথে যখন বেরোলাম, কুয়াশা রঙ্গা সবুজের মাঝে ভিজে থাকা বুনো ফুলের ঝাড় স্নানাসিক্ত যুবতী আদিবাসী নারীর রূপের মতো নতুন নেশা ধরাল আবার। নানা রঙের ঝরা পাতা, ফিকে সবুজ কিশলয়, ডানা ঝেড়ে উড়ে যাওয়া বুনো পোকা – মর্চে রঙা মাটির ওপরে এই সবের ঝিলিমিলি। তারই মাঝে ফুটে আছে জলপাই রঙের কুঁড়ির সাথে সাদা ঘেঁটু ফুল। সম্পূর্ণ অচেনা সুবাস তার, কিন্তু ভারী মিষ্টি। জঙ্গুলে রাস্তা, তার ধারে পড়ে আছে লাল পাথরের দল, তারা ইতিহাসের খতিয়ান। এপিটাফ। পাশের শালগাছগুলো পাহাড় যেন হিসেব করে পুঁতেছে – এক পাথরের এক গাছ। যদি বা কোথাও হিসেব ভুল হয়ে থাকে, তাকে ঢেকে রেখেছে কুয়াশার রহস্য দিয়ে। তাকিয়ে থাকো, ঐ বুঝি, ওপাশ দিয়ে কিছু কি বেরিয়ে এলো? মনে হল মেঘেরা সত্যিই বন্ধু এই লাল পাহাড়ের – কাঁদছে আজকে।
লাল মাটির মাঝখান দিয়ে পিচের পাহাড়ি রাস্তা সমতলে নেমে এলো। মাঝে একটু দাঁড়িয়ে একখানা খনির ছবি তুলছিলাম অনেক দূর থেকে, কয়েকজন কর্মচারী জীপে করে এসে একটু ধমকে গেলেন, অনুমতি ছাড়া নিয়ম নেই নাকি। তা কি আর করা, গাড়ীতে উঠে একটু পরেই পৌঁছে গেলাম বড়জামদা। রাস্তায় দেখেছি, এখানেও দেখছি, বৃষ্টির জল মিশেছে লাল মাটির সঙ্গে, সে যখন রাস্তার ওপর দিয়ে যাচ্ছে, রক্ত বলে ভুল হতে পারে। সমতলে কুয়াশা নেই, কিন্তু মেঘের চাদরে আকাশ ঢাকা, সবই ঘোলাটে, তার মাঝে রাস্তায় আমাদের উল্টোদিকে ছুটে যাচ্ছে জঙ্গলের গাছে সারি, আর মাঝে মাঝে দু একটা দোকানপাট। উইন্ডশিল্ডে বৃষ্টির ছাঁট পড়ে গড়িয়ে নামছে, ছোট ছোট পাহাড়ী ঝর্নার মতো। মানুষের তৈরি ওয়াইপার তাকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা করছে যেমন চেষ্টা করে সব প্রাকৃতিক সুন্দরতা কে, কিন্তু সেই ঝরনা থামার নয়, তা আঁকিবুকি বেড়েই চলেছে। লাল মাটি আর কাঁকর, বৃষ্টি ভেজা হলুদ পাতার গাছ, তার হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মতো বুনো গাছে উজ্জ্বল লাল ফুল, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছাতা ভাগাভাগি করে হেঁটে যাওয়া ভাই আর দিদি, নতুন পাওয়া বৌকে নতুন পাওয়া বাইকের পেছনে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া যুবক – এসব পেছনে ফেলে একটা খুব সুন্দর সাজানো শহরে ঢুকে পড়লাম – নাম নোয়ামুন্ডি।
চকচকে দর্পভারি পিচের রাস্তা, দুপাশে ঘাসের ওপরে একতলা কোয়ার্টার, তার সামনে বাগানে ডাঁটা ঝুলে থাকা সজনে গাছ, একটু খানি বেড়া দেওয়া ফুলের বাগানে দু একটা গাঁদা, একজনের বাড়ীর সামনে রাখা আদ্যিকালের একটা উইলিস জীপ, কোথাও একটা নেড়িকুকুর খাবার খুঁজছে টিপ টিপ বৃষ্টির মাঝে, মাথায় ঝুড়ি নিয়ে কাজে যাচ্ছে সুখলালের বৌ – এই শহরটাও ফুরিয়ে গেলো চট করে। ফের আমরা আধা পাহাড়ী রাস্তায় এসে পড়েছি, সিকিওরিটির গেট পেরিয়ে। স্বপনদা ফোন করেছিল, কথা বলতে বলতেই সিগন্যাল চলে গেলো, আর তার ঠিক পাঁচ মিনিট পরেই পৌঁছে গেলাম মুর্গা মহাদেব।

মৃগ, সেই ভাবান্তরে মুর্গা হয়ে গেছে। একখানা পাহাড়ী নদী, তার একটা জলপ্রপাত, সেখানেই তৈরি হয়েছে এই মন্দির। যেখানে আমরা গাড়ী রাখলাম, সেখানে একটা বাঁধানো চত্ত্বর, ওপাশে তোরণ। সেই তোরণের দুটো গেট – একটায় ঢুকলে মন্দিরে পৌঁছনো যায়, অন্যটা তার সমান্তরাল সিঁড়ি, তাই দিয়ে নিচে নেমে গেলে একদম সোজা জলপ্রপাতের সামনে। আমাদের মন্দিরে তেমন উৎসাহ নেই, তাই বাঁয়ের গেট ধরলাম। বাঁধানো সিঁড়ি, নেমে গেছে প্রায় দেড়শো ধাপ, তাতে বৃষ্টির হল পড়ে চকচক করছে, তার ওপরে পড়ে আছে, পর পর দু টো ধাপে, একটা করে শিমূল ফুল। দেখে মনে হল, লাল পাহাড়ের বন্ধু মেঘেরা যখন কেঁদে কেঁদে ঘোলাটে চোখে তাকিয়ে ছিল পৃথিবীর পানে, আমিও খুঁজছিলাম তাকেই, দুটো কথা ছিল কইবার। দেখা হল, কথা খুব হল না। পাহাড় বড় আনমনা সেদিন। চলে যাবে বলেই, মনটাও ভালো নেই, সেই পাথরের পাহাড়ের। তার শক্ত পাথরও যেন তখন গলা মাখন বোলানো, এমন চকচকে। তার’পরে শিমূল ছুঁড়ে দিয়েছে দু খানা ফুল তার, ভালোবাসার শেষ চিঠি হবে। তার পাশে মুখ দেখতে চাইছিলাম, নিজের আর তোমার। পেয়েছি, আবছা আধখানা, কিন্তু চাইলে পরে, চেনা যায়।
নিচে নেমে লালচে ঘোলা জলের জলপ্রপাত দেখে ওপরে উঠে এলাম। মনে চঞ্চলতা এসেছে একটু যেন, সে ঐ পাগলা জলের স্রোতের প্রভাব হতে পারে। দু পাশে পাতা, রংবাহার, বসন্তের দিন আসছে। বৃষ্টি পড়েই চলেছে। গাড়িতে উঠে বসলাম, ঘন্টা দেড়েকে পৌঁছতে হবে জোড়া।
জঙ্গল আর ছোট ছোট টিলার মাঝ দিয়ে রাজপথ, মাঝে একবার দেখলাম, অনেক দুরে একটা নদী, তাতে এক যুবতী স্নান করছে, লাল কাপড় তার ভিজে গায়ে, নদীর পাড়ে ব্যস্ত পাহারায় তার পুরুষ। ঠিক যেমন করে জঙ্গলের স্নানের সময়ে তাকে পাহারা দিত পাহাড়। মনে হল, পাহাড় থাকবে না বেশীদিন, এই যুবক টি আরেকটু কম। ভাবুক হওয়ার সময় আমার আছে, ধনঞ্জয়জির নেই – কারন উলটো দিক থেকে পর পর ছুটে আসছে ট্রাকের সারি – পাহাড়ের বুকের টুকরো ভরা তার পিঠে। জোড়ায় পৌঁছে খেয়ে নিলাম – বেশ ভালো খাবার জায়গা, কলকাতার মতোই, শুধু পরিমানে বেশী আরো। সৌম্যর দাঁতে ব্যাথা শুরু হয়েছে, ও শুধু স্যুপ খেলো।
জঙ্গল আর ছোট ছোট টিলার মাঝ দিয়ে রাজপথ, মাঝে একবার দেখলাম, অনেক দুরে একটা নদী, তাতে এক যুবতী স্নান করছে, লাল কাপড় তার ভিজে গায়ে, নদীর পাড়ে ব্যস্ত পাহারায় তার পুরুষ। ঠিক যেমন করে জঙ্গলের স্নানের সময়ে তাকে পাহারা দিত পাহাড়। মনে হল, পাহাড় থাকবে না বেশীদিন, এই যুবক টি আরেকটু কম। ভাবুক হওয়ার সময় আমার আছে, ধনঞ্জয়জির নেই – কারন উলটো দিক থেকে পর পর ছুটে আসছে ট্রাকের সারি – পাহাড়ের বুকের টুকরো ভরা তার পিঠে। জোড়ায় পৌঁছে খেয়ে নিলাম – বেশ ভালো খাবার জায়গা, কলকাতার মতোই, শুধু পরিমানে বেশী আরো। সৌম্যর দাঁতে ব্যাথা শুরু হয়েছে, ও শুধু স্যুপ খেলো।
হান্ডিভাঙ্গা জলপ্রপাত কোথায়, সে খবর ধনঞ্জয়জিও রাখেন না। স্বপনদার পথনির্দেশ মেনে এগোতে লাগলাম দক্ষিণ মুখে, ঠিক হল পাঁচটার মধ্যে না পেলে ফিরে যাবো। মাঝে একজন সুরাসক্ত পথনির্দেশক
পেয়েছিলাম, ভরসা করতে পারিনি, কিন্তু দেখলাম তার কথাই ঠিক। সাড়ে চারটেয় কালিমাটি পৌঁছলাম, জোড়া থেকে সত্তর কিলোমিটার হবে, সেখানে হাইওয়ে বেঁকে গেছে বাঁ দিকে, আমরা একটা আধপাকা রাস্তায় ঢুকে পড়লাম, ডান দিকে, পেট্রোল পাম্পের পাশ দিয়ে। এই রাস্তায় বাড়ী ঘর দোর নেই, ঝোপ আর জঙ্গল, মাঝে মাঝে খুব ছোট খাদান কয়েকটা, রাস্তা শেষ হয়ে গেলো মিনিট পনেরো যাওয়ার পরে। সেখানে সামনে একটা ছোট মন্দির, তার ডানদিকে একটা টিলার ওপরে একটা হনুমান মূর্তি, পাশে পাথর ফেলা রাস্তা, আর মন্দিরের পাশে একটা ঝুপড়ি বাড়ী, তার সামনে তিনটে বাচ্চা খেলছে। আমার ভাঙ্গা উড়িয়ায় তাদের থেকে কনফারমেশন নিলাম – এটাই হান্ডিভাঙ্গা। গাড়ী থেকে নেমে হাঁটা দিলাম ঐ পাথরের পথ ধরে। রক্ত রঙ্গা পাথর, চকচকে, পিচ্ছিল, তার মাঝে সবুজের ঝলক ফার্নের ডালে, দুই পারে নানা রঙের বৃষ্টিতে ভেজা শুকনো পাতা, নিস্তব্ধ, নিঝুম, মাঝে মাঝে উচ্ছল জলধারার ওপর দিয়ে কাঠের ডাল দিয়ে সাঁকো –
আসতে আসতে ওপরের দিকে উঠছে রাস্তা। কোথাও আবার বাঁধানো সিঁড়ি, কোনো এক বিধায়কের কল্যাণে। অন্ধকার হয়ে আসছে। ভয় লাগছে। মিনিট পনেরো যাওয়ার পরে পাহাড় গুলো একদম যেন ঘাড়ের ওপরে উঠে এলো, একটা চাটানের মতো জায়গা, বাঁধানো, আর তার ওপাশেই প্রচন্ড শব্দে আছড়ে পড়ছে হান্ডিভাঙ্গা নদী। প্রায় একশো মিটার ওপর থেকে। তার আওয়াজে সৌম্যর কথা ভেসে গেলো, ক্যামেরার ক্লিক অনুভব করছি, শুনতে পাচ্ছিনা, পাগলের মতো ছবি তুলছি আমি, সৌম্য আর দেবদীপ। যখন আঁধারে আর কিছুই প্রায় দেখা যাচ্ছে না, ভয়টা আবার ফিরে এলো, রওনা দিলাম গাড়ীর উদ্দ্যেশ্যে। বোলানী হয়েই ফিরলাম, রাস্তায় দেখে নিলাম আলোয় ঝলমল করা খনি আর শহর, পাহাড়ের অনেকটা ওপর থেকে। কিরিবুরু গেস্ট হাউসে তখন কুয়াশা ঢেকে রেখেছে সবকিছু।
পেয়েছিলাম, ভরসা করতে পারিনি, কিন্তু দেখলাম তার কথাই ঠিক। সাড়ে চারটেয় কালিমাটি পৌঁছলাম, জোড়া থেকে সত্তর কিলোমিটার হবে, সেখানে হাইওয়ে বেঁকে গেছে বাঁ দিকে, আমরা একটা আধপাকা রাস্তায় ঢুকে পড়লাম, ডান দিকে, পেট্রোল পাম্পের পাশ দিয়ে। এই রাস্তায় বাড়ী ঘর দোর নেই, ঝোপ আর জঙ্গল, মাঝে মাঝে খুব ছোট খাদান কয়েকটা, রাস্তা শেষ হয়ে গেলো মিনিট পনেরো যাওয়ার পরে। সেখানে সামনে একটা ছোট মন্দির, তার ডানদিকে একটা টিলার ওপরে একটা হনুমান মূর্তি, পাশে পাথর ফেলা রাস্তা, আর মন্দিরের পাশে একটা ঝুপড়ি বাড়ী, তার সামনে তিনটে বাচ্চা খেলছে। আমার ভাঙ্গা উড়িয়ায় তাদের থেকে কনফারমেশন নিলাম – এটাই হান্ডিভাঙ্গা। গাড়ী থেকে নেমে হাঁটা দিলাম ঐ পাথরের পথ ধরে। রক্ত রঙ্গা পাথর, চকচকে, পিচ্ছিল, তার মাঝে সবুজের ঝলক ফার্নের ডালে, দুই পারে নানা রঙের বৃষ্টিতে ভেজা শুকনো পাতা, নিস্তব্ধ, নিঝুম, মাঝে মাঝে উচ্ছল জলধারার ওপর দিয়ে কাঠের ডাল দিয়ে সাঁকো –
আসতে আসতে ওপরের দিকে উঠছে রাস্তা। কোথাও আবার বাঁধানো সিঁড়ি, কোনো এক বিধায়কের কল্যাণে। অন্ধকার হয়ে আসছে। ভয় লাগছে। মিনিট পনেরো যাওয়ার পরে পাহাড় গুলো একদম যেন ঘাড়ের ওপরে উঠে এলো, একটা চাটানের মতো জায়গা, বাঁধানো, আর তার ওপাশেই প্রচন্ড শব্দে আছড়ে পড়ছে হান্ডিভাঙ্গা নদী। প্রায় একশো মিটার ওপর থেকে। তার আওয়াজে সৌম্যর কথা ভেসে গেলো, ক্যামেরার ক্লিক অনুভব করছি, শুনতে পাচ্ছিনা, পাগলের মতো ছবি তুলছি আমি, সৌম্য আর দেবদীপ। যখন আঁধারে আর কিছুই প্রায় দেখা যাচ্ছে না, ভয়টা আবার ফিরে এলো, রওনা দিলাম গাড়ীর উদ্দ্যেশ্যে। বোলানী হয়েই ফিরলাম, রাস্তায় দেখে নিলাম আলোয় ঝলমল করা খনি আর শহর, পাহাড়ের অনেকটা ওপর থেকে। কিরিবুরু গেস্ট হাউসে তখন কুয়াশা ঢেকে রেখেছে সবকিছু।
পরের দিন সকালটা আবার অন্যরকম, আলো ঝলমলে, উজ্জ্বল। কালকের কুয়াশার কোনো হদিশ নেই আজ। সকালে গেলাম সারান্ডার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে অনেক কটা আদিবাসী গ্রাম পেরিয়ে কারো নদীর তীরের শিব মন্দিরে। লেখার পাইনি কিছু – এই জঙ্গল শুধুই অনুভব করার। ঘন, গহীন, কিছু দেখা যায় না, কিন্তু রহস্য ভরা, গাছের ফাঁক দিয়ে খুব জোর পঞ্চাশ মিটার দেখা যায়, সেখানে নিঝুমতা আর অন্ধকারের আড্ডা।
এরই মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে উইয়ে খেয়ে যাওয়া শালগাছের গুঁড়ির অবশিষ্ট, তার যৌবনের বলিষ্ঠতার ছাপ নিয়ে। মন্দিরের পুজারী সকালে আসেন মোটর সাইকেল নিয়ে, দশটার মধ্যে চলে যান, তারপর জঙ্গলটা হয়ে যায় তার নিজের। পুজারীজি নারকেল খাওয়ালেন প্রসাদ হিসেবে, সেই খেয়ে নিচে নামলাম নদীর পাড়ে। একটা ছোট জলপ্রপাত আছে, দেখে নিয়ে ফেরত এলাম একটা অদ্ভুত অশরীরী ফিলিং নিয়ে। গাড়ী আসবে, দেখতে যাবো মেঘাহাতুবুরু খনি, আজ দুপুরে।
গাড়ী এলো। সাহেবের নিজের গাড়ী। তাতে চেপে ঢুকে পড়লাম পাহাড়ের হৃদয়ে। পাহাড় কাটা হচ্ছে, বেরিয়ে আসছে লাল আকর। ছবি তোলা অনুমতি সাপেক্ষ, ড্রাইভার সাহেব বলে দিলেন কোথায় তোলা যায়, আর কোথায় যায়না। একদম সমতলে নেমে এলাম খনির ভেতর দিয়ে, তারপর যন্ত্রপাতি দেখতে দেখতে উঠে এলাম ওপরে আবার। লাল আর লাল শুধু, মাথার ওপরে কেবল আকাশের নীল। সন্ধ্যার মুখে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে মনে হল, আচ্ছা, এই পাহাড় তো তাহলে একদিন ফুরিয়ে যাবে? হাতির পাহাড় থাকবে না আর।
মেঘেরা আর ছুঁয়ে যাবে না পাহাড়ের চুড়ায় দাঁড়ানো মানুষের হাত।
আজ থেকে অনেক অনেক দিন পর, সে আজকের কথা নয়, কালকের কথাও নয়, তারও অনেক দিন পরে, একদিন এক থুত্থুড়ে শনচুলো বুড়ী ঠাকুমা তার পুঁচকি নাতনীকে রাতের বেলায় বলবে “তবে বলি শোন মা, ঐ যে মাঠ, ওইখানে ছিল একটা পাহাড় – এত বড়ো, যে তার মাথায় উঠলে হাতের মুঠোয় ধরা পড়তো বাদলা আকাশ, তাই তার নাম ছিল মেঘাহাতুবুরু। তারপর শহর থেকে লোক এসে কাটতে থাকলো তার বুক, সেখানে নাকি পাওয়া যায় লোহা, সেই থেকে হয় ইস্পাত। কাটতে কাটতে সেই বুক শেষ, দেহ শেষ, তার বুকের রোমের মতো জঙ্গল ও নেই, সে পাহাড় ও নেই, মেঘগুলো কেঁদে কেঁদে উড়ে বেড়ায় শুধু – তাদের বন্ধু পাহাড় হারিয়ে গেছে বেবাক। কিছুই নেই আর। শুধু শহর থেকে তিনটে পাগলা মানুষ এসে ভালবেসে ফেলেছিলো তাকে, ছবি তুলে রেখেছিল, সেগুলো আছে, আর আছে তাদের মন গুলো। তারা কেন এসেছিল, কি করে তাদের ঐ পাহাডের সাথে তাদের ভালোবাসা হলো, সে গল্প কালকে শুনিস দিদিভাই।” সেই বুড়িকে আমি মীনাবাজারে দেখেছি, সে এখন খুব ছোট, ফ্রক পরে এক্কা দোক্কা খেলছিলো তার ভাইয়ের সাথে, আমার দেওয়া বিস্কুট ভাইয়ের সঙ্গে ভাগ করে খেয়েছে সে।


















Comments
Post a Comment